স্যামসাংয়ের ট্রাইফোল্ড ফোনে স্মার্টফোনের ভবিষ্যতের আভাস
বিজ্ঞান কল্পকাহিনির গল্পে যেমন দেখা যায়, ইচ্ছেমতো ভাঁজ করা যায়—এমন ফোনকে বাস্তবে রূপ দিতে নতুন এক ধাপ এগোল স্যামসাং। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রযুক্তি জায়ান্টটি তাদের নতুন গ্যালাক্সি জেড ট্রাইফোল্ড ফোনের মাধ্যমে স্মার্টফোনের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে প্রযুক্তি বিশ্বকে।
যুক্তরাষ্ট্রের লাস ভেগাসে চলমান কনজ্যুমার ইলেকট্রনিকস শো (সিইএস)–এ প্রথমবারের মতো ফোনটি প্রদর্শন করেছে স্যামসাং। এর আগে নিজ দেশের বাজার দক্ষিণ কোরিয়ায় সীমিত পরিসরে ফোনটি উন্মুক্ত করা হয়। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও এটি আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
গ্যালাক্সি জেড ট্রাইফোল্ড নাম থেকেই বোঝা যায়, ফোনটি তিন ভাগে ভাঁজ করা যায়। এতে দুটি ভাঁজ রয়েছে এবং দেখতে এটি অনেকটা ভাঁজ করা ব্রোশারের মতো। ভাঁজ করা অবস্থায় এটি একটি সাধারণ স্মার্টফোনের আকার নেয়, আর পুরোপুরি খুললে ট্যাবলেটের মতো বড় স্ক্রিন পাওয়া যায়।
ফোনটির ভেতরের স্ক্রিনের আকার ১০ ইঞ্চি। তুলনায় স্যামসাংয়ের গ্যালাক্সি জেড ফোল্ড ৭–এর স্ক্রিন ৮ ইঞ্চি এবং সেখানে রয়েছে একটি ভাঁজ। ট্রাইফোল্ডে দুটি ভাঁজ থাকার ফলে ব্যবহারযোগ্য জায়গা আরও বড় হয়েছে, যা একসঙ্গে একাধিক কাজে সুবিধা দেবে।
খোলা অবস্থায় ফোনটি বেশ পাতলা এবং হাতে নিলে তুলনামূলক হালকা মনে হয়। তবে ভাঁজ করলে সেটি মোটা হয়ে যায়, যেন দুটি ফোন একসঙ্গে ধরা হয়েছে। এ কারণে ফোন হিসেবে এক হাতে ব্যবহার কিছুটা অস্বস্তিকর হতে পারে।
এখনো ফোনটির দাম আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি স্যামসাং। তবে ধারণা করা হচ্ছে, এর দাম বেশ চড়া হবে। কারণ গ্যালাক্সি জেড ফোল্ড ৭–এর দামই প্রায় ২ হাজার ডলার থেকে শুরু হয়। সেই হিসাবে ট্রাইফোল্ডের দাম আরও বেশি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ফোন মূলত সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য নয়। এটি স্যামসাংয়ের একটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগ, যার মাধ্যমে নতুন ধরনের ফোন বাজারে মানুষ কীভাবে গ্রহণ করে, তা বোঝার চেষ্টা করা হচ্ছে। কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চের সহযোগী পরিচালক লিজ লি একে ‘কৌশলগত পরীক্ষা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
তবে ফোনটির গুরুত্ব একেবারেই কম নয়। কারণ স্যামসাং বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্মার্টফোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। তাদের নতুন পণ্য প্রায়ই বাজারে নতুন ধারা তৈরি করে, যেমনটি অতীতে ফোল্ডেবল ফোনের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে।
স্যামসাং বলছে, গ্যালাক্সি জেড ট্রাইফোল্ড মূলত কাজ ও উৎপাদনশীলতার কথা মাথায় রেখে তৈরি। বড় স্ক্রিনে একসঙ্গে একাধিক অ্যাপ চালানো যাবে, স্প্লিট স্ক্রিনে কাজ করা যাবে এবং ডেস্কটপ কম্পিউটারের মতো আলাদা উইন্ডোতেও অ্যাপ ব্যবহার সম্ভব হবে।
ব্লুটুথ কিবোর্ড ও মাউস যুক্ত করলে এটি ছোট ল্যাপটপের বিকল্প হিসেবেও ব্যবহার করা যাবে। অফিসের কাজ, লেখা কিংবা প্রেজেন্টেশন তৈরির মতো কাজ সহজে করা সম্ভব হবে বলে দাবি করছে প্রতিষ্ঠানটি।
ফোনটিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারও বাড়ানো হয়েছে। গুগলের জেমিনি এআই একসঙ্গে স্ক্রিনে খোলা একাধিক অ্যাপের তথ্য বুঝে ব্যবহারকারীকে সহায়তা করবে। এতে কাজের গতি ও দক্ষতা বাড়বে বলে স্যামসাংয়ের দাবি।
ক্যামেরার ক্ষেত্রেও আপস করেনি প্রতিষ্ঠানটি। গ্যালাক্সি জেড ট্রাইফোল্ডের ক্যামেরা প্রায় গ্যালাক্সি এস২৫ আলট্রার সমমানের। বড় স্ক্রিন থাকা সত্ত্বেও ক্যামেরার মানে ছাড় দেওয়া হয়নি। যদিও স্ক্রিনে দুটি ভাঁজের দাগ রয়েছে, তবে তা খুব বেশি চোখে পড়ে না।
বিশ্বজুড়ে ফোল্ডেবল ফোনের বাজার এখনো তুলনামূলকভাবে ছোট। দাম বেশি এবং ব্যবহার সীমিত হলেও প্রায় সব বড় অ্যান্ড্রয়েড নির্মাতা এখন এই ধরনের ফোন আনছে। এমনকি অ্যাপলও ভবিষ্যতে ফোল্ডেবল ফোন আনতে পারে বলে গুঞ্জন রয়েছে।
সব মিলিয়ে গ্যালাক্সি জেড ট্রাইফোল্ড হয়তো এখনই সবার হাতে পৌঁছাবে না। তবে এটি স্পষ্ট করে দেখিয়ে দিচ্ছে, স্মার্টফোনের উন্নয়ন থেমে নেই। ভবিষ্যতে ফোন কেমন হতে পারে—তার একটি শক্ত ইঙ্গিতই দিল স্যামসাং।


















