শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড ও রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত: বাংলাদেশ-ভারতের দ্বৈত প্রভাব
বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আদালত সম্প্রতি এই রায় ঘোষণা করলেও কার্যকর করার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে রয়েছেন ভারতের অবস্থান। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারত ইতিমধ্যেই নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়েছে এবং প্রত্যর্পণ চুক্তির নিয়ম অনুযায়ী রাজনৈতিক কারণে কাউকে ফেরত পাঠানো হবে না।
শেখ হাসিনা একসময় ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতীক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ১৯৭০-এর দশকে তার বাবার হত্যাকাণ্ডের পর তিনি রাজনৈতিকভাবে আত্মপ্রকাশ করেন। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে তার পথ ধীরেধীরে নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়। ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুতি এবং ভারতের নির্বাসনে পালানোর ঘটনা তা স্পষ্ট করে। ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমন করার অভিযোগে তিনি দোষী সাব্যস্ত হন। ১৫ বছরের স্বৈরশাসনের পর ভারতে আশ্রয় নেন, যা তার জীবনে ভারতের প্রতি আস্থা দৃঢ় করে।
১৯৭৫ সালের আগস্টে বাবা শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর তিনি পশ্চিম জার্মানিতে ছিলেন এবং বেঁচে যান। ১৯৮১ সালে দেশে ফেরার পর জনগণের সাড়া তাকে রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী করে। ১৯৯৬ সালে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তার নেতৃত্বে দেশের ১৫ বছরের শাসনকালকে তীক্ষ্ণভাবে মূল্যায়ন করা হয়—অর্থনৈতিক উন্নতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের মধ্যে এক ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিচ্ছবি দেখা যায়।
গত বছরের শিক্ষার্থী আন্দোলন ছিল তার পতনের প্রধান কারণ। সরকারি চাকরির কোটা নিয়ে শুরু হওয়া আন্দোলন দেশের নানা জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে, এবং সরকারের কঠোর দমন-পীড়নে ইউনাইটেড নেশনসের হিসাব অনুযায়ী প্রায় ১৪০০ জন নিহত হন। আন্দোলন শেষ পর্যন্ত তার সরকারের পতন ঘটায় এবং তিনি ভারতে পালিয়ে যান।
আদালত রায়ে উল্লেখ করেছে, শিক্ষার্থীদের হত্যার নির্দেশ এবং আন্দোলন দমনে তার ভূমিকা সম্পূর্ণ স্পষ্ট। এই রায় ঘোষণা হলে আদালত কক্ষে কান্না এবং করতালিতে ভরে ওঠে। ভারতের বর্তমান অবস্থান হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর সম্ভাবনা কঠিন করে তুলেছে। সাবেক কূটনীতিকরা মনে করছেন, ভারত এটি রাজনৈতিক অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করবে এবং কোনো তাড়াহুড়ো করবে না।
আগামী ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে সামনে রেখে এই মৃত্যুদণ্ড বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব অনিশ্চিত, এবং অন্তর্বর্তী সরকার দেশকে রাজনৈতিক বিভাজন থেকে রক্ষা করার কঠিন দায়িত্বে নিয়োজিত। বিএনপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দল এই পরিস্থিতি কাজে লাগাতে পারে, আর আওয়ামী লীগের পুনরাগমন সম্ভব হলেও শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নয়। ফলে দেশের রাজনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তার সম্ভাবনা দৃঢ় হয়ে দাঁড়িয়েছে।



















