পরিকল্পনাহীনতায় অকেজো ৩০ লাখ সোলার হোম সিস্টেম
মাঠপর্যায়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়া সোলার হোম সিস্টেম স্থাপন এবং দ্রুত গ্রিড সম্প্রসারণের কারণে দেশে বিগত দিনে বসানো ৬০ লাখ সোলার হোম সিস্টেমের অর্ধেক বা প্রায় ৩০ লাখ সিস্টেমই সম্পূর্ণ অকেজো ও অকার্যকর হয়ে পড়ে আছে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ‘সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ’ (সিপিডি) পরিচালিত ‘এসএইচএস সার্ভে ২০২৫’ শীর্ষক গবেষণায় এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। আজ মঙ্গলবার (২৩ জুন) গুলশানের একটি অভিজাত হোটেলে বাজেট-পরবর্তী সেমিনারে এই গবেষণা প্রবন্ধটি উপস্থাপন করা হয়।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডি’র গবেষণা সহকারী আতিকুজ্জামান সাজিদ। সিপিডি’র গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি।
সিপিডি’র প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৩ সালে ‘ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের (ইডকল) হাত ধরে প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকায় অফ-গ্রিড বিদ্যুতায়নের এক বৈপ্লবিক যাত্রা শুরু হয়েছিল। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন দাতা সংস্থার অর্থায়নে এবং সহযোগী এনজিওদের মাধ্যমে পরিচালিত এই উদ্যোগে ২০১৩ সালে রেকর্ড ৮ লাখ ৫৩ হাজার সোলার হোম সিস্টেম ইনস্টল করা হয়। তবে এর পরপরই ২০১৪ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়াই দেশজুড়ে দ্রুত গতিতে জাতীয় গ্রিডের লাইন সম্প্রসারিত হওয়ায় সোলার হোম সিস্টেমগুলো গ্রাহকদের কাছে প্রাসঙ্গিকতা হারাতে শুরু করে। যার ফলে ২০১৮ সালে এসে বার্ষিক সোলার ইনস্টলেশন ৯৯ দশমিক ৬ শতাংশ কমে মাত্র ৩ হাজার ৪৫৫টিতে নেমে আসে।
সীমিত সক্ষমতার সোলার হোম সিস্টেমের চেয়ে প্রাকৃতিকভাবেই গ্রাহকেরা জাতীয় গ্রিডের দিকে ঝুঁকে পড়েন। তবে মাঠপর্যায়ে সোলার বিক্রির কিস্তি ও ঋণ বিতরণ চালুর পাশাপাশি পূর্ব-ঘোষণা ছাড়াই পল্লী বিদ্যুতের লাইন সম্প্রসারণের মতো প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের অভাব বড় বিপর্যয় ডেকে আনে। এই পরিকল্পনাহীন রূপান্তরের কারণে মাঠপর্যায়ের সহযোগী এনজিও ও অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে এবং লাখ লাখ অকার্যকর সোলার সিস্টেমের নষ্ট ব্যাটারি ও প্যানেল গ্রামীণ অঞ্চলে এখন নতুন পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি করছে।
এই সমীক্ষা অনুসারে, সোলার হোম সিস্টেম চালুর মাধ্যমে দেশের প্রায় ২ কোটিরও বেশি মানুষকে বিদ্যুতের আওতায় আনা সম্ভব হলেও বর্তমানে বসানো সিস্টেমগুলোর প্রায় ৪৭ শতাংশই অকেজো। বাংলাদেশে সোলার ট্রানজিশনকে সফল করতে সিপিডি কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সোলার প্যানেল ও ইনভার্টারের শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা, আবাসিক গ্রাহকদের জন্য নেট মিটারিং পদ্ধতি সহজ ও ডিজিটাল করা, এবং ব্যাংকগুলোর জন্য সোলার সম্পদকে জামানত হিসেবে গ্রহণের আইনি ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করা।
এছাড়াও সেচ পাম্পগুলোকে জাতীয় গ্রিডের সাথে যুক্ত করে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ বিক্রির সুযোগ দেওয়া, ডিজেল সেচের ওপর ভর্তুকি ধাপে ধাপে কমিয়ে আনা, এবং পুরোনো অকেজো সোলার হোম সিস্টেমগুলোকে হাইব্রিড বা গ্রিড-টাইড সিস্টেমে রূপান্তর করার সুপারিশ করেছে সংস্থাটি। একই সাথে স্রেডার (SREDA) নেতৃত্বে একটি জাতীয় সমন্বয় কমিটি গঠন করে রিয়েল-টাইম ডেটা সিস্টেমের মাধ্যমে সোলারের স্থায়িত্ব ও কার্যকারিতা মনিটর করার দাবি জানানো হয়েছে।

















