দেশের অর্থনীতি রক্তক্ষরণ অবস্থায় ব্যবসায়ীদের প্রতি উদাসীনতার অভিযোগ বিসিআই সভাপতির
দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে ‘রক্তক্ষরণ’-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই)-এর সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ। তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতির রক্তক্ষরণ হচ্ছে, আমরা চিৎকার করলেও সরকার শোনছে না এবং ব্যবসায়ী মহলের প্রতি তারা উদাসীন।
বৃহস্পতিবার (২৭ নভেম্বর) বনানীর পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) কার্যালয়ে মাসিক অর্থনৈতিক পর্যালোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ সব কথা বলেন আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পিআরআইয়ের চেয়ারম্যান জাইদী সাত্তার, এবং মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংস্থাটির প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমান।
তিনি জানান, ২০২২ সালের পর থেকে জ্বালানি সরবরাহ সংকট ক্রমশ বাড়ছে। সরকার দাম বৃদ্ধি করলেও পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ করতে পারেনি, ফলে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। প্রায় ৫০ শতাংশ ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে, এবং অনেকেই ঢাকায় এসে টেসলা (অটোরিকশা) চালাতে বাধ্য হচ্ছেন। শহরের জনসংখ্যা ইতোমধ্যে সাড়ে তিন কোটিতে পৌঁছেছে।
বিসিআই সভাপতি ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের অবস্থার উপরও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার ভাষ্য, খেলাপি ঋণ ১৭ শতাংশে থাকাকালীন আইএমএফ বাংলাদেশকে ‘মধ্যম ঝুঁকিপূর্ণ’ বলেছিল, কিন্তু এখন তা ৩৫ শতাংশ ছাড়িয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, এই অস্বাভাবিক ঋণবৃদ্ধির ফলে দেশের ঋণব্যয় আরও বাড়বে এবং উৎপাদন খাতে ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হবে।
পিআরআইয়ের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর সংস্করণের এমএমআই প্রতিবেদনে বলা হয়, রপ্তানি বৃদ্ধি, রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং মুদ্রাস্ফীতি কিছুটা কমে আসায় অর্থনীতিতে প্রাথমিক স্থিতিশীলতার আভাস মিলেছে। তবে বিনিয়োগ কমে যাওয়া, বেসরকারি ঋণপ্রবৃদ্ধি মন্থর থাকা এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে সামগ্রিক পুনরুদ্ধার এখনও নাজুক। প্রতিবেদনে উল্লেখ, দেশের অনাদায়ী ঋণ ২৫ বছরে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা পুরো আর্থিক খাতকেই ঝুঁকির মুখে ফেলেছে এবং এনপিএল ‘বিষাক্ত চাপ’ তৈরি করছে।
পিআরআইয়ের চেয়ারম্যান জাইদী সাত্তার বলেন, অর্থনীতির গতি কমলেও স্থিতিশীলতা এসেছে এবং কর্মসংস্থান বাড়াতে আরও উদার নীতি গ্রহণ প্রয়োজন। প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে এনপিএল-সংকট এমন মাত্রায় পৌঁছেছে যা মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সমন্বিত সমাধান কাঠামো প্রয়োজন। তিনি বলেন, উচ্চ সুদ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তারল্য সহায়তা এবং উৎপাদন খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়া– সব মিলিয়ে দেশ ‘উচ্চ সুদ, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও নিম্ন বিনিয়োগের’ দুষ্টচক্রে পড়েছে।
প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. নাসিরউদ্দিন আহমেদ, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. একেএম আতিউর রহমান, বিল্ড-এর গবেষণা পরিচালক ড. ওয়াসেল বিন সাদাতসহ অন্যান্যরা। তারা করনীতি, রপ্তানি বৈচিত্র্য, দক্ষতা উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে দেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।



















