ঢাকার কাছাকাছি একাধিক ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল, বড় বিপর্যয়ের ইঙ্গিত নাকি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে একাধিক মাঝারি ও মৃদু মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। এর মধ্যে সর্বশেষ গত ২২শে জুন সোমবার রাতে চার দশমিক চার মাত্রার একটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়, যার উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকা থেকে মাত্র ১৬ কিলোমিটার দূরে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে। এর আগে গত পহেলা ফেব্রুয়ারি গাজীপুরের কালিয়াকৈরে এবং গত বছরের ২১শে নভেম্বর নরসিংদীর মাধবদীতে ৫.৭ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়েছিল, যা গত কয়েক দশকে দেশের অভ্যন্তরে তৈরি হওয়া অন্যতম শক্তিশালী কম্পন।
একের পর এক ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ঢাকার আশপাশে হওয়ায় সাধারণ মানুষের পাশাপাশি বিশেষজ্ঞদের মনেও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক গবেষণা সংস্থা ইউএসজিএস এবং বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় বছরে বাংলাদেশ ও এর সীমান্তবর্তী এলাকায় বেশ কিছু ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল ছিল ঢাকার খুব কাছাকাছি। বিশেষ করে গত বছরের নভেম্বর মাসে নরসিংদী ও ঢাকার বাড্ডা এলাকায় মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে পরপর চারটি ভূমিকম্পের ঘটনা ঘটে, যাতে সে সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে ১০ জন নিহত এবং সাড়ে চার শতাধিক মানুষ আহত হন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. বদরুদ্দোজা মিয়া জানান, এই কম্পনগুলো মূলত টেকটোনিক কার্যকলাপ বা দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকা কোনো পুরোনো ফল্ট পুনরায় সক্রিয় হয়ে ওঠার কারণে হতে পারে। বাংলাদেশ মূলত ইউরেশিয়ান, ইন্ডিয়ান এবং বার্মিজ—এই তিন প্লেটের সংযোগ স্থলের মাঝামাঝি অবস্থানে থাকায় অঞ্চলটি প্রাকৃতিকভাবেই ভূমিকম্পপ্রবণ। তবে সাম্প্রতিক এই ছোট কম্পনগুলো বড় কোনো ভবনধসের কারণ না হলেও, এগুলোকে ভবিষ্যতের বড় দুর্যোগের সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন গবেষকরা।
বুয়েটের পূরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও ভূমিকম্প গবেষক মেহেদি আহমেদ আনসারী বলেন, ঐতিহাসিকভাবে ঢাকা বা নরসিংদীতে বড় ভূমিকম্পের রেকর্ড না থাকলেও ঢাকার পার্শ্ববর্তী শ্রীমঙ্গল ও বগুড়ার শেরপুর অঞ্চলে অতীতে ৭-এর বেশি মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়েছে। প্রতিটি ভূমিকম্পের একটি নির্দিষ্ট চক্র বা ‘রিটার্ন পিরিয়ড’ থাকে এবং সেই হিসাব অনুযায়ী ৭ মাত্রার একটি ভূমিকম্প যেকোনো সময় ঢাকা ও এর আশপাশের অঞ্চলে আঘাত হানতে পারে। এমন বড় বিপর্যয় ঘটলে দেশে বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।
ঢাকার ভৌগোলিক ও অবকাঠামোগত নিরাপত্তা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা জানান, মাটির গঠন বিবেচনা করলে রমনা, গুলশান, ধানমন্ডি বা মিরপুরের মতো মধুপুরের শক্ত লাল মাটির এলাকাগুলো তুলনামূলক নিরাপদ। অন্যদিকে পূর্ব ও পশ্চিমের নরম পলিমাটি এবং ভরাট করা জলাশয়ের এলাকাগুলো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। তবে চূড়ান্ত নিরাপত্তা নির্ভর করছে ভবনের নির্মাণশৈলীর ওপর। পুরান ঢাকার সরু রাস্তার কারণে সেখানে দুর্যোগকালীন উদ্ধারকাজ কঠিন হলেও, নতুন ঢাকার অপরিকল্পিত বহুতল ভবনগুলোও সমান ঝুঁকিতে রয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশের সীমান্ত ও অভ্যন্তরে ডাউকি ও মধুপুর ফল্টসহ পাঁচটি প্রধান চ্যুতি রেখা চিহ্নিত রয়েছে। তবে গবেষকদের মতে, সবচেয়ে বড় বিপদের কারণ হতে পারে ‘ব্লাইন্ড ফল্ট’, যা ভূ-পৃষ্ঠে দৃশ্যমান না হওয়ায় সাধারণ মানচিত্রে শনাক্ত করা যায় না। এই ধরনের অদৃশ্য ফল্ট লাইনগুলো থেকে কোনো পূর্ব সতর্কবার্তা পাওয়া যায় না, যা ঘনবসতিপূর্ণ রাজধানী ঢাকার জন্য ভবিষ্যতে সবচেয়ে বড় ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।



















