গণমাধ্যমে তথ্য বিকৃতি ও মিসকোটিংয়ের মহামারি চলছে: প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব
বাংলাদেশের গণমাধ্যমে তথ্য বিকৃতি ও মিসকোটিংয়ের প্রবণতা ভয়াবহ আকারে ছড়িয়ে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। সোমবার (১০ নভেম্বর) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এই অভিযোগ করেন।
তিনি লিখেছেন, “বাংলাদেশের সংবাদপত্র ও টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে মিসকোট করার প্রবণতা এখন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে এটি গুরুতর অপরাধ, যার কারণে সম্প্রতি বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের প্রধান ও এর একজন শীর্ষ সাংবাদিক চাকরি হারিয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশে এমনকি সবচেয়ে বড় গণমাধ্যমের নামগুলিও এই অপরাধে দোষী।”
শফিকুল আলম জানান, কয়েক দিন আগে একটি শীর্ষস্থানীয় বাংলা দৈনিক তার এক বক্তব্য বিকৃতভাবে প্রকাশ করেছে। তার মতে, প্রতিবেদক সম্ভবত বক্তৃতার অডিও কোনো এআই ট্রান্সক্রিপশন টুল দিয়ে লিখিত আকারে রূপান্তর করেছেন, যার ফলে ভুল শব্দ ও বাক্য তৈরি হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, “আমি যখন ‘Touch’ শব্দটি বলছিলাম, সফটওয়্যারটি সেটিকে শুনেছিল ‘Kaaz’, ফলে প্রতিবেদনে ছাপা হয়েছে ‘কাজ’।”
তিনি আরও জানান, সমস্যা এখানেই শেষ হয়নি—ওই ভুল প্রতিবেদন হুবহু কপি করে একাধিক অনলাইন নিউজ পোর্টালেও ছাপানো হয়েছে। “এখন এমন ঘটনা প্রায় প্রতিদিনই ঘটে,” উল্লেখ করে তিনি বলেন, “শুরুতে আমি ফোন করে সংশোধনের দাবি জানাতাম, কিন্তু এখন আর সে সময় বা আগ্রহ নেই।”
প্রেস সচিবের মতে, সবচেয়ে বড় হুমকি এসেছে এখন “ফটোকার্ড সাংবাদিকতা” থেকে। তিনি বলেন, “প্রতিদিনই বিশেষ করে বসুন্ধরা গ্রুপের মালিকানাধীন গণমাধ্যম এবং বিএনপিপন্থী সাংবাদিকদের প্রভাবিত কিছু চ্যানেল ও ওয়েবসাইট চেরি-পিক করা উদ্ধৃতি নিয়ে ভ্রান্ত ও প্রেক্ষাপটবিহীন গ্রাফিক বানাচ্ছে।” উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, “আমি সিরডাপে ২৭ মিনিটের বক্তৃতা দিয়েছিলাম, কিন্তু তারা মাত্র একটি লাইন নিয়ে প্রতিবেদন বানিয়েছে, ফলে বক্তব্যের মূল বার্তাই বিকৃত হয়ে গেছে।”
টেলিভিশন বিশ্লেষক ও ইউটিউবারদের নিয়েও তিনি কড়া সমালোচনা করেন। তার ভাষায়, “তারা পুরো প্রতিবেদন বা বক্তব্য শোনেন না, বরং নিজেদের আগাম ধারণার সঙ্গে কিছু সত্য আর অসংখ্য মিথ্যার মিশ্রণ ঘটিয়ে ভিডিও বানান। প্রতিদিনই ভুল তথ্যভরা ভিডিও প্রকাশ করা হচ্ছে, অথচ তাদের কারও গবেষণা বা ফ্যাক্ট-চেকিংয়ের দক্ষতা নেই।”
এক উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, “এক নারী ইউটিউবার দাবি করেছিলেন, প্রফেসর ইউনূস ও তার কন্যার সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়ার ছবিটি নকল। অথচ ছবিটি হোয়াইট হাউস থেকে প্রকাশ করা হয়েছিল।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, “আমি মন্তব্য করলে ওই ইউটিউবারের স্বামী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মিডিয়া স্টাডিজের অধ্যাপক, তার পক্ষে ঝাঁপিয়ে পড়েন। হাসিনার আমলে তারা এমন কিছু ভাবতে পারতেন না।”
এছাড়া সাংবাদিক আনিস আলমগীরের একটি বক্তব্যেরও সমালোচনা করেন শফিকুল আলম। তার দাবি, “আনিস আলমগীর বলেছেন, প্রফেসর ইউনূস নাকি বিদেশি গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকারের জন্য পিআর এজেন্সিগুলোকে কোটি টাকার বেশি অর্থ দিয়েছেন—এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা। প্রফেসর ইউনূস কখনো কোনো পিআর এজেন্সিতে এক পয়সাও দেননি।” তিনি আনিস আলমগীরকে প্রমাণ উপস্থাপনের চ্যালেঞ্জ জানান।
প্রেস সচিব বলেন, “আজকের কাগজ থেকে উঠে আসা আনিস আলমগীর এমন এক প্রজন্মের প্রতিনিধি, যারা কখনো যথাযথ সূত্র বা রেফারেন্সের প্রতি যত্নবান ছিলেন না। ইরাক যুদ্ধের সময় বাগদাদের হোটেল রুম থেকে যুদ্ধের গল্প লিখেছিলেন, হোটেল ছাড়াই!”
বিবিসির সাম্প্রতিক পদত্যাগ প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, “ট্রাম্পের বক্তব্য মিসকোট করায় বিবিসির দুই শীর্ষ সাংবাদিক পদত্যাগ করেছেন। অথচ বাংলাদেশে প্রতিদিনই পাবলিক ফিগারদের বক্তব্য বিকৃত করা হয়, প্রেক্ষাপট বাদ দিয়ে এক-দুই লাইনকে হাইলাইট করা হয়। আর আপনি প্রতিবাদ করলে তারা ‘সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা’র দোহাই দেয়।”
শেষে তিনি বলেন, “এই হলো আমাদের গণমাধ্যমের বর্তমান অবস্থা—দায়িত্বহীন, জবাবদিহির ঊর্ধ্বে এবং সত্য থেকে বহু দূরে।”


















