বুধবার, ১৬ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬| রাত ৯:৫২

ইসলামিক বিপ্লবের পর যেসব ভয়াবহ ঘটনায় কেঁপেছিল ইরান

প্রতিবেদক
staffreporter
জানুয়ারি ১৩, ২০২৬ ৬:৩২ অপরাহ্ণ
ইসলামিক বিপ্লবের পর যেসব ভয়াবহ ঘটনায় কেঁপেছিল ইরান

ইসলামিক বিপ্লবের পর যেসব ভয়াবহ ঘটনায় কেঁপেছিল ইরান

১৯৭৯ সালে ইসলামিক বিপ্লবের মাধ্যমে ইরানের শেষ শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির পতন ঘটে এবং দেশটি এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রবেশ করে। ওই বিপ্লবের পর থেকেই ইরান একের পর এক নিষেধাজ্ঞা, যুদ্ধ, হত্যাকাণ্ড, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও আন্তর্জাতিক সংঘাতের মধ্য দিয়ে গেছে, যা দেশটির রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।

১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে দীর্ঘ ১৪ বছর নির্বাসন শেষে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি ইরানে ফিরে আসেন। ইরাক ও ফ্রান্সে নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে ফিরে এসে তিনি বিপ্লবের নেতৃত্ব দেন। ওই বছরের এপ্রিলে সংবিধানে সংশোধনী এনে ইরানকে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করা হয়। একই বছরের নভেম্বর মাসে তেহরানে মার্কিন দূতাবাস দখল করে কয়েকজন মার্কিন নাগরিককে জিম্মি করা হলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। উল্লেখ্য, এর আগে ১৯৫৩ সালে ইরানের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেগকে ক্ষমতাচ্যুত করার সামরিক অভ্যুত্থানে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের ভূমিকা ছিল।

১৯৮০ সালে ইরাক ইরানের ওপর হামলা চালালে শুরু হয় দীর্ঘ আট বছরব্যাপী ইরান-ইরাক যুদ্ধ। এই যুদ্ধে পাঁচ লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু হয় এবং সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ে ইরান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই যুদ্ধে পরিখা যুদ্ধ, মেশিনগান ও বেয়নেটের ব্যাপক ব্যবহার দেখা যায়। ইরাক এই যুদ্ধে ইরানি বাহিনী ও কুর্দিদের বিরুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্রও ব্যবহার করে।

১৯৮১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক কিছুটা স্বাভাবিক হয়, যখন ইরান মার্কিন জিম্মিদের মুক্তি দেয়। তবে ওই বছরই জুন মাসে ইসলামিক রিপাবলিকান পার্টির সদর দপ্তরে ভয়াবহ বোমা হামলায় বিচার বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ বেহেস্তিসহ বহু শীর্ষ নেতা নিহত হন। আগস্টে আরেকটি বোমা হামলায় প্রাণ হারান প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আলী রাজাই ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ জাভাদ বাহোনার। এসব হামলার জন্য বিদ্রোহী সংগঠন মোজাহেদিন-ই-খালককে দায়ী করা হয়।

১৯৮২ সালে লেবাননে ইসরায়েলের আগ্রাসনের পর সেখানে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দিতে শুরু করে ইরান। এই প্রক্রিয়ায় হিজবুল্লাহর উত্থান ঘটে। ১৯৮৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস ভিনসেনেস ইরানের একটি বেসামরিক বিমান ভূপাতিত করে, যাতে ২৯০ জন যাত্রী নিহত হন। একই বছর জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় ইরান-ইরাক যুদ্ধের অবসান ঘটে।

১৯৮৯ সালে ইসলামিক বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনির মৃত্যু হলে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নতুন সুপ্রিম লিডার হিসেবে নির্বাচিত হন। পরের বছর ১৯৯০ সালে ইরানে ভয়াবহ ভূমিকম্পে প্রায় ৪০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। ১৯৯৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর তেল ও বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, সন্ত্রাসবাদে সহায়তা ও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির অভিযোগ তুলে।

২০০২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ইরানকে ‘এক্সিস অব ইভিল’-এর অংশ হিসেবে আখ্যা দেন। ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে হামলা চালানোর পর সেখানে শিয়া গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দিতে শুরু করে ইরান। আন্তর্জাতিক চাপে পড়ে ওই বছরই ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি স্থগিত ও আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থাকে পরিদর্শনের অনুমতি দেয়। একই বছরে আরেকটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে প্রায় ৪০ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে।

২০০৬ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র ধাপে ধাপে ইরানের ওপর কঠোর পারমাণবিক ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ২০১১ সালে সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হলে প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে সমর্থন দিতে ইরান বিপ্লবী গার্ড পাঠায়। ২০১২ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইরানের তেল বয়কট করে এবং একই বছরে ইরানি রিয়ালের মূল্য ডলারের বিপরীতে প্রায় ৮০ শতাংশ কমে যায়।

২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষর করে ইরান, যার বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। তবে ২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সেই চুক্তি বাতিল করে নতুন করে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। ২০২০ সালে ইরানের প্রভাবশালী কুদস ফোর্সের প্রধান কাসেম সোলাইমানি যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলায় নিহত হন।

২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে হিজাববিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়, যা দমন করতে গিয়ে শত শত মানুষ নিহত হন। ২০২৪ সালে সিরিয়ার দামেস্কে ইরানি দূতাবাসে ইসরায়েলি হামলায় বিপ্লবী গার্ডের দুই জেনারেলসহ সাতজন নিহত হন। একই বছর হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মৃত্যু ইরানকে আরও বড় ধাক্কা দেয়।

২০২৫ সালের জুনে ইরান ও দখলদার ইসরায়েলের মধ্যে ১২ দিনব্যাপী সরাসরি যুদ্ধ হয়। এতে ৬১০ জন ইরানি এবং ২৮ জন ইসরায়েলি নিহত হন। ইসলামিক বিপ্লবের পর থেকে এই দীর্ঘ সময়জুড়ে যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা ও সংকট ইরানকে বারবার কাঁপিয়ে দিয়েছে এবং দেশটির ইতিহাসে গভীর ছাপ রেখে গেছে।

সূত্র: আলজাজিরা

মন্তব্য করুন
Spread the love

সর্বশেষ - রাজনীতি