ইউরোপগামী অভিবাসন রুটে দ্রুতগতির নৌকা ব্যবহারে নতুন ঝুঁকি
ইউরোপে পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে এখন ক্রমবর্ধমান সংখ্যায় অত্যন্ত দ্রুতগতির শক্তিশালী নৌকা ব্যবহার করছে পাচারকারীরা। জার্মান সংবাদসংস্থা ডিপিএ জানায়, এসব নৌকার গতি এত বেশি যে উপকূলরক্ষীদের পক্ষে অনেক সময়ই সেগুলোকে আটকে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে যাত্রার সময় কমলেও ঝুঁকি হয়ে উঠছে আরও ভয়াবহ। এতদিন ছোট নৌকা ও রাবার ডিঙ্গিই অনিয়মিত অভিবাসীদের প্রধান ভরসা ছিল, কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে পাচারকারীরা ব্যবহার করছে ১৪০০ হর্সপাওয়ার পর্যন্ত ইঞ্জিনযুক্ত নৌকা, যা রেসিংয়ে ব্যবহৃত ফর্মুলা–১ গাড়ির শক্তির কাছাকাছি।
ডিপিএ জানায়, এসব নৌকার দৈর্ঘ্য প্রায় ১৪ মিটার পর্যন্ত হয় এবং গতি ঘণ্টায় ১২০ কিলোমিটারেরও বেশি। উপকূলরক্ষীরা বলছে, এ ধরনের নৌকা থামানোর কোনো বৈধ উপায় নেই—গুলি করা বা ধাক্কা দিলে যাত্রীদের জীবন ঝুঁকিতে পড়ে। ফ্রন্টেক্সের তথ্যমতে, নৌকাগুলো আকারে ছোট হওয়ায় সেগুলো ধরা ও চিহ্নিত করাও কঠিন। দ্রুত মোড় নেওয়ার সক্ষমতা পাচারকারীদের পালাতে আরও সহায়তা করে। লিবিয়া থেকে ইতালি এবং মরক্কো–আলজেরিয়া উপকূল থেকে স্পেনমুখী রুটে গত কয়েক মাসে এসব নৌকার ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
যাত্রার গতি বাড়লেও মৃত্যুঝুঁকিও বহুগুণ বেড়েছে। এত দ্রুতগতিতে কেউ পানিতে পড়ে গেলে মৃত্যুর সম্ভাবনা প্রায় নিশ্চিত, কারণ পানির পৃষ্ঠ তখন কংক্রিটের মতো শক্ত হয়ে ওঠে। ইইউর পানিসীমায় কম সময় কাটাতে পাচারকারীরা উপকূলের কাছাকাছি এসে গতি কমিয়ে দেয় এবং অনেক যাত্রীকে বাধ্য করে পানিতে লাফিয়ে সাঁতার কেটে তীরে পৌঁছাতে। কখনো আবার অস্ত্রের মুখে নেমে যেতে হয়। যাত্রার শুরুতেও অনেক সময় অভিবাসীদের সাঁতার কেটে নৌকায় উঠতে বলা হয়, যাতে পানির অগভীরতায় নৌকা আটকে না যায়।
অতিরিক্ত ভাড়ার বোঝা যাত্রীদের ওপর ভয়াবহ চাপ সৃষ্টি করছে। অনেককে বাধ্য করা হচ্ছে শ্রম বা যৌন নিপীড়নের বিনিময়ে খরচ কমাতে। কেউ কেউ ইউরোপে পৌঁছে যৌনকর্মে যুক্ত হওয়ার অঙ্গীকার করতেও বাধ্য হয়। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু অভিবাসীকে পাচারকারীরা মাদক বহনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে, যাদের পেটে ছোট প্যাকেটে মাদক ভর্তি করে পাঠানো হয়। প্যাকেট ফেটে গেলে তাৎক্ষণিক মৃত্যুর ঝুঁকি থাকলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যাত্রীদের এ বিষয়ে কিছু জানানো হয় না।
গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভের তথ্যমতে, মরক্কো–আলজেরিয়া থেকে স্পেনমুখী রুটে গত দুই বছরে মাদক ও মানবপাচার একত্রে পরিচালনার প্রবণতা বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পাচারকারীরা এখন দ্রুতগতির নৌকা ব্যবহার করে মাদক নয়, মানুষ পরিবহনকেই বেশি লাভজনক মনে করছে। গ্রিসেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে—উপকূলরক্ষীরা এখন রাবার নৌকা নয়, বরং পূর্বে মাদক ও চোরাচালানে ব্যবহৃত দ্রুতগতির নৌকাই বেশি আটক করছে। পাচারকারীরা দুই ধরনের অবৈধ ব্যবসা মিলিয়ে অতিরিক্ত লাভবান হওয়ার চেষ্টা করছে।



















