ইউজিসি বিলুপ্ত করে উচ্চশিক্ষা কমিশন গঠনের পথে সরকার
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বিলুপ্ত করে নতুন করে উচ্চশিক্ষা কমিশন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে ‘বাংলাদেশ উচ্চশিক্ষা কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর একটি খসড়া প্রস্তুত করে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত চেয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। গত ১০ ডিসেম্বর জারি করা নোটিসে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে মতামত দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। প্রাপ্ত মতামত পর্যালোচনা শেষে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানা গেছে।
উদ্যোক্তাদের মতে, নতুন এই কমিশন প্রতিষ্ঠিত হলে উচ্চশিক্ষা খাত আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থেকে বেরিয়ে আরও স্বাধীনভাবে পরিচালিত হওয়ার সুযোগ পাবে। ইউজিসির তুলনায় কমিশনের ক্ষমতা, মর্যাদা ও কার্যপরিধি বাড়বে বলে তারা আশা করছেন। তবে এ উদ্যোগ সফল করতে হলে যথাযথ প্রক্রিয়ায় যোগ্য ও অভিজ্ঞ নেতৃত্ব নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেও সংশ্লিষ্টরা মত দিয়েছেন।
শিক্ষাবিদরা এই উদ্যোগের জন্য ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকে ধন্যবাদ জানালেও এর সম্ভাব্য সফলতা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। অনেকেই মনে করছেন, সবার মতামত বিবেচনায় নিয়ে অধ্যাদেশটি চূড়ান্ত করে কার্যকর করা না হলে এটি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বায়ত্তশাসন ও একাডেমিক স্বাধীনতার বদলে আরও গভীর بيرোক্র্যাটিক নিয়ন্ত্রণ সৃষ্টি করতে পারে।
খসড়া অধ্যাদেশে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৭৩ সালের ‘ইউনিভার্সিটি গ্রান্টস কমিশন অব বাংলাদেশ অর্ডার’ রহিত করে নতুন অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা হচ্ছে। অধ্যাদেশ কার্যকর হলে ইউজিসি বিলুপ্ত হয়ে তার স্থলে ‘বাংলাদেশ উচ্চশিক্ষা কমিশন’ প্রতিষ্ঠিত হবে, যা একটি সংবিধিবদ্ধ ও আইনগত ব্যক্তিসত্তা হিসেবে কাজ করবে। কমিশনের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি অর্জন, সংরক্ষণ ও হস্তান্তরের ক্ষমতা থাকবে এবং নিজ নামে মামলা দায়ের বা মোকাবিলা করতে পারবে। কমিশনের নিজস্ব মনোগ্রাম ও পতাকাও থাকবে।
সূত্র জানায়, উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে এ ধরনের কমিশন গঠনের চিন্তা আগের আওয়ামী লীগ সরকারের সময় শুরু হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নতুন করে উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং ইউজিসির নয় সদস্যের একটি টিম খসড়া অধ্যাদেশ প্রস্তুত করে। এই টিমের আহ্বায়ক ছিলেন ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান।
তিনি জানান, প্রধান উপদেষ্টার আগ্রহ ও সাবেক শিক্ষা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের সময় দায়িত্ব পেয়ে তারা সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে অধ্যাদেশটি প্রস্তুত করেন। বর্তমানে ইউজিসি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজ করায় বাজেট ও সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। নতুন কমিশন হলে শিক্ষকদের নেতৃত্বে আরও স্বাধীন ও কার্যকরভাবে উচ্চশিক্ষা পরিচালনার সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
খসড়া অনুযায়ী, কমিশনের কার্যালয় ঢাকায় থাকবে এবং প্রয়োজনে বিভাগীয় বা আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপন করা যাবে। কমিশন গঠিত হবে একজন চেয়ারম্যান, আটজন কমিশনার এবং ১০ জন খণ্ডকালীন সদস্য নিয়ে। সার্চ কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে চেয়ারম্যান ও কমিশনাররা চার বছরের জন্য নিয়োগ পাবেন এবং দ্বিতীয় মেয়াদে পুনর্নিয়োগের সুযোগ থাকবে।
চেয়ারম্যান পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে পিএইচডিধারী খ্যাতিমান শিক্ষাবিদ, যিনি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে কমপক্ষে ২৫ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা ও ব্যাপক প্রশাসনিক দক্ষতা সম্পন্ন, তাকেই যোগ্য বলে বিবেচনা করা হবে। চেয়ারম্যান ক্যাবিনেট মন্ত্রীর সমমর্যাদাসম্পন্ন পদে দায়িত্ব পালন করবেন এবং কমিশনাররা সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতির সমমর্যাদা পাবেন।
এ উদ্যোগ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাভান্না স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. সিরাজুল আই ভূঁইয়া মন্তব্য করেছেন, অতিরিক্ত ক্ষমতা একটি কেন্দ্রীয় সংস্থার হাতে কেন্দ্রীভূত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন, একাডেমিক স্বাধীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়তে পারে। তবে প্রতিবেশী দেশগুলোর অভিজ্ঞতা ও শিক্ষাবিদদের মতামত বিবেচনায় নিয়ে সঠিকভাবে কমিশনটি কার্যকর করা গেলে এটি সফল হতে পারে বলেও তিনি মত দেন।
ইউনিভার্সিটি টিচার্স ফোরামের প্রধান সংগঠক কবীর উদ্দিন বলেন, নতুন কমিশন যেন শুধু চেয়ারম্যান ও সদস্যদের মর্যাদা বৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধ না থাকে। এর মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়ন, সম্প্রসারণ এবং বিশ্বমানের জনশক্তি তৈরি।
বর্তমানে দেশে অনুমোদিত সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১৭২টি। এর মধ্যে সরকারি ৫৬টি এবং বেসরকারি ১১৬টি। অধিভুক্ত কলেজ ও মাদরাসাসহ উচ্চশিক্ষা খাতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৪৮ লাখের বেশি। এসব প্রতিষ্ঠান তদারকির জন্য ১৯৭২ সালে ইউজিসি প্রতিষ্ঠা করা হলেও নানা সীমাবদ্ধতায় প্রতিষ্ঠানটি দুর্বল হয়ে পড়ায় নতুন ও শক্তিশালী কমিশন গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।



















